সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রথম পাতা » আর্ন্তজাতিক | ইউরোপ | শিরোনাম | সাবলিড » ইউরোপজুড়ে বিক্ষোভ, কেন ক্ষুব্ধ তরুণেরা
ইউরোপজুড়ে বিক্ষোভ, কেন ক্ষুব্ধ তরুণেরা
বিবিসি২৪নিউজ,ইইউ প্রতিনিধি: ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজপথে নেমেছেন তরুণেরা। কোথাও শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিতে, কোথাও আবাসনসংকট ও জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের প্রতিবাদে, আবার কোথাও দুর্নীতি ও সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন তারা। এসব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে জেনারেশন জেড বা জেন জি নামে পরিচিত তরুণ প্রজন্ম। সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির পাশাপাশি এসব বিক্ষোভ সামনে নিয়ে এসেছে বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে জমে থাকা অসন্তোষ।
দেশভেদে বিক্ষোভের কারণ ভিন্ন হলেও তরুণদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে কিছু অভিন্ন বিষয়। তারা মনে করছেন, আগের প্রজন্মের মতো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও উন্নত জীবন পাওয়ার সুযোগ তাদের সামনে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে তার বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা আবাসনসংকটবিরোধী বিক্ষোভের অন্যতম অনুঘটক হয়ে ওঠে। ফ্রান্সে ধর্মঘটরত শিক্ষকদের সমর্থনে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। আর আলবেনিয়ায় কয়েক মাস ধরে চলা ছাত্রবিক্ষোভের সূত্রপাত হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থনপুষ্ট একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্কের পর।
এসব আন্দোলন একে অপরকেও প্রভাবিত করছে। ইতালি ও গ্রিসের বিক্ষোভকারীরা তাদের স্লোগানে ফ্রান্সের আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেছেন। স্পেনে আবাসনসংকটের প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে পর্তুগালেও। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ছাত্রসংগঠন নিজেদের অভিজ্ঞতা ও আন্দোলনের কৌশল পরস্পরের সঙ্গে ভাগাভাগি করছে বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রধান ছাত্রসংগঠন ইউএনইএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস দ্য ব্রিতো।
তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের আন্দোলনের মধ্যে পার্থক্যের চেয়ে মিলই বেশি। শিক্ষায় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আবাসনসংকটের বিষয়গুলোও সামনে আসছে।
ইতালির ছাত্রসংগঠনের নেতা সাবরিনা ব্রিজোলাও একই ধরনের দাবি তুলে ধরেছেন। গত সপ্তাহান্তে এক সমাবেশে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ কর্মসংস্থান, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
ইউরোপিয়ান করেসপন্ডেন্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক জুলিয়াস ফিন্টেলমানের মতে, এসব বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে তরুণদের মধ্যে এমন একটি হতাশা প্রকাশ পাচ্ছে যে ইউরোপের রাজনীতি নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না।
শিক্ষা ও আবাসনসংকটে বাড়ছে ক্ষোভ
ফ্রান্সে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে শিক্ষাবর্ষ শুরুর সময় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। গত নয় বছর ধরে শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ থেকে এ ধরনের আন্দোলন হয়ে আসছে। তবে এবার আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো, শিক্ষকদের পেছনে বরাদ্দ বাড়ানো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং তরুণদের ওপর পুলিশি সহিংসতা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
অ্যালিস দ্য ব্রিতোর ভাষ্য, ‘মানুষ এখন আর উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত।’
গ্রিসেও হাজারো শিক্ষার্থী ও শিক্ষক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবিতে মিছিল করেছেন। এথেন্সে পার্লামেন্টের সামনে সমবেত একদল বিক্ষোভকারী স্লোগান দেন, ‘গ্রিস থেকে ফ্রান্স- আমরা চাই সরকারি ও বিনা মূল্যের শিক্ষা।’
ইতালিতেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ফ্রান্সের বিক্ষোভের প্রভাব দেখা গেছে। গত ৭ অক্টোবর রোমের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় দখলে নেওয়ার পর শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মকাণ্ডের পক্ষে দেওয়া বিবৃতির শুরুতেই লিখেছিলেন, ‘ফ্রান্সের মতো’।
তবে ইতালির সরকার দুই দেশের পরিস্থিতির মধ্যে মিলের বিষয়টি নাকচ করার চেষ্টা করেছে। দেশটির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা দাবি করেন, ফ্রান্সের পরিস্থিতি ইতালির চেয়ে আলাদা। ফরাসি বিক্ষোভের পেছনে অভিবাসীদের দ্বিতীয় প্রজন্মকে শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার সমস্যা রয়েছে বলে দেশটির ডানপন্থীদের একটি দাবিও তিনি পুনরাবৃত্তি করেন।
শিক্ষার পাশাপাশি আবাসনসংকটও ইউরোপজুড়ে তরুণদের ক্ষোভের বড় কারণ হয়ে উঠেছে। ইতালির বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন, তারা স্পেনের আবাসনসংকটবিরোধী আন্দোলন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে স্পেনে এ আন্দোলন জোরালো হয়ে ওঠে।
রোমে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একটি দল সিএনএনকে জানায়, সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাও কঠিন। শিক্ষার্থী এলিসা পাস্তোরে বলেন, তিনি ও তার ভাই রোমে একই কক্ষ ভাগাভাগি করে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচের পাশাপাশি সেই কক্ষের ভাড়া জোগাতেও তাদের হিমশিম খেতে হয়। ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে পড়াশোনার খরচ বাঁচাতে তাকে রোমের বাইরে থেকে ১২০ কিলোমিটার যাতায়াত করতে হতো।
কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ
শিক্ষা ও আবাসনসংকটের পাশাপাশি চাকরির বাজারের অনিশ্চয়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবও তরুণদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে, কর্মজীবনের শুরুতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য যেসব চাকরি গুরুত্বপূর্ণ, সেসব ক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব বেশি পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এর সঙ্গে জলবায়ু সংকটও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
জুলিয়াস ফিন্টেলমানের মতে, উদার গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ছিল- পরবর্তী প্রজন্ম আগের প্রজন্মের চেয়ে ভালো জীবন পাবে। কিন্তু তরুণদের একটি অংশের কাছে সেই প্রতিশ্রুতি এখন আর বাস্তব বলে মনে হচ্ছে না।
বিক্ষোভের পেছনে অর্থনৈতিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের যেসব দেশে আন্দোলন বেশি দৃশ্যমান- গ্রিস, ইতালি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেন ও পর্তুগাল- সেসব দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারি ঋণের চাপ জনসেবা খাতে ব্যয় বাড়ানোর পথ কঠিন করে তুলছে। ফ্রান্সে সরকারি বন্ডের সুদহারও বেড়েছে, যা সরকারের বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
ছড়িয়ে পড়ছে আন্দোলন
আবাসনসংকটের প্রতিবাদে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের রসিও স্কয়ারে প্রতিদিন সন্ধ্যায় হাজারো মানুষ সমবেত হচ্ছেন। কেউ কেউ সেখানে তাঁবু খাটিয়েছেন। মঙ্গলবার ভোরে ৫৫ জনকে গ্রেপ্তারের পর নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা বাড়িভাড়া বৃদ্ধির সীমা নির্ধারণ এবং উচ্ছেদ সহজ করার নতুন আইন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
ইতালিতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে ট্রাকচালকেরাও অবরোধ করেছেন। এর ফলে মহিষের দুধের তৈরি মোৎজারেলা পনিরসহ কিছু খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এসব ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে, অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব শুধু তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বিভিন্ন বয়সের মানুষও আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছেন।
আলবেনিয়া ও সার্বিয়ায় দীর্ঘদিনের বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুর্নীতিবিরোধী দাবি। এসব আন্দোলন কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকার পরিবর্তনের দাবিতেও রূপ নিয়েছে। আলবেনিয়ায় গত সপ্তাহে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠার পর প্রধানমন্ত্রী এদি রামা পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীরা দেশটির ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের পরিকল্পনাকে হুমকির মুখে ফেলছেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অস্থিরতার জন্য দায়ী করেন।
সার্বিয়ায় গত দুই বছর ধরে চলা ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলন দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। রোববারের সংসদীয় নির্বাচনে দীর্ঘদিনের নেতা আলেকসান্দার ভুচিচের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এই আন্দোলন।
ফ্রান্সেও নতুন করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার প্যারিস, মার্সেই, লিওঁ, লিল, অর্লেয়াঁ ও বোর্দোসহ বিভিন্ন শহরে কয়েক হাজার মানুষ মিছিল করেন। ছাত্রসংগঠন ইউএনইএফের আয়োজনে প্যারিসের মিছিলে অংশ নেন শ্রমিক সংগঠন, কৃষক, জলবায়ুকর্মী এবং ২০১৮ সালে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সদস্যরা।
আন্দোলনের বিস্তার ঠেকাতে বিভিন্ন দেশে নতুন কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে। ফ্রান্স ও স্পেনের বড় শ্রমিক সংগঠনগুলো যথাক্রমে ৫ ও ১১ নভেম্বর সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। জার্মানিতে ‘জেন জি রেগেল্ট’ নামে একটি গোষ্ঠী ৩১ অক্টোবর দেশজুড়ে বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের ছাত্রসংগঠনগুলো শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ২০ নভেম্বর কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করছে।
সব মিলিয়ে ইউরোপের তরুণদের আন্দোলন এখন আর কোনো একটি দেশের নির্দিষ্ট দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় ও রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নে বিভিন্ন দেশের তরুণদের ক্ষোভ এক জায়গায় এসে মিলছে। তাদের মূল উদ্বেগ- ভবিষ্যতে একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়ার সুযোগ আদৌ থাকবে কিনা।




কমনওয়েলথ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকবে: হুমায়ুন কবির
বারাক ওবামা ‘চরম অযোগ্য’: ট্রাম্প
বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, বিভিন্ন শহরে কাঁদানো গ্যাসের শেল নিক্ষেপ, গ্রেপ্তার ১৩৫
নাগরিকদের সৌদি ছাড়ার পরামর্শ দিল ইতালি
মার্কিন নির্ভরতা কমাতে তুরস্কের সঙ্গে কানাডার নতুন জোট
প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে টোকিওতে থাকবেন না রাষ্ট্রদূত, সমন্বয়ে থাকবে সচিব
মধ্যপ্রাচ্য থেকে গোপনে সেনা সরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডের তালিকায় রয়েছে আরও ২০ বাংলাদেশি
হুতিদের হামলা থেকে সৌদিকে সুরক্ষা দিতে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান মোতায়েন 